প্রানঘাতী কোভিড-১৯ চিকিৎসায় টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালের গৃহীত পদক্ষেপ, কার্যক্রম এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন

স্থান: লেকচার গ্যালারী, টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, বগুড়া।

তারিখ: ০৯ জুলাই ২০২০ইং (বৃহষ্পতিবার)

সময়: দুপুর ১২.০০ ঘটিকা

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ!

আস্সালামু আলাইকুম।

বিশ্বজুড়ে মহামারীর রূপ নেওয়া নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমন এবং বিস্তার পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশকেও এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ভাইরাসটির করাল থাবায় দেশে একদিকে যেমন প্রতিনিয়তই করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিক তেমনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মিছিলও ক্রমাগত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। যা দেশের বিদ্যমান চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থাকে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। করোনায় আক্রান্ত রোগী বৃদ্ধির ফলে একদিকে যেমন হাসপাতালগুলোতে মারাত্মক সেবা সংকট তৈরী হয়েছে ঠিক বিপরীত দিকে নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসা প্রদান ব্যবস্থাও ব্যপকহারে সংকুচিত হয়েছে। টিএমএসএস কর্তৃপক্ষ টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ এন্ড রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালের মাধ্যমে করোনা রোগীদের চিকিৎসা, করোনা প্রতিরোধ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানাবিধ পদক্ষেপ ও কার্যক্রম গ্রহনের মাধ্যমে বিরাজমান সংকট মোকাবেলায় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে। আবার পাশাপাশি নন কোভিড রোগীর সেবা দানও অব্যাহত রেখেছে। মূলত কোভিড-১৯ প্রতিরোধ এবং প্রতিকারে টিএমএসএস গৃহীত কার্যপদ্ধতি, লব্ধ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা সকলের সামনে তুলে ধরার জন্যই আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে, যেন এর মাধ্যমে প্রয়োজন বোধে অন্যান্য সরকারী ও বেসরকারী স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সাথে করোনা চিকিৎসায় আমাদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি বা বিনিময় করা যায়।

প্রিয় সহযোদ্ধা বন্ধুগণ!

আপনারা অবগত আছেন যে, দেশের মোট হাসপাতাল শয্যার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোর তত্ত্বাবধানে। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য যে, করোনা সংকটে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের অংশগ্রহণ অদ্যাবধি তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এই দূর্যোগকালীন সময়ে চিকিৎসা সেবার পরিসরকে হয় সীমিত করেছে, না হয় অনেকক্ষেত্রে পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অন্যান্যদের মত পলায়নের স্রোতে গা না ভাসিয়ে টিএমএসএস স্বাস্থ্য সেক্টরের অন্তর্ভূক্ত ১ হাজার শয্যা বিশিষ্ট (অনুমোদিত ৭৫০ শয্যা) টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ্ কমিউনিটি হাসপাতাল বগুড়া ও পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহের কোভিড রোগী এবং নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসার এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল হিসেবে আস্থা অর্জনে সচেষ্ট রয়েছে। কোভিড আক্রান্ত ব্যক্তি এবং অন্যান্য সাধারণ রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের জন্য হাসপাতালটির এক দল দক্ষ এবং নিবেদিত কর্মী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এমন দূর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে সকল রোগী তা তিনি কোভিড আক্রান্ত বা অন্য যে কোনো রোগী, কেউই যেন হাসপাতালের সেবা থেকে বঞ্চিত না হন সেই নীতি সামনে রেখেই কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রিয় সুহৃদ

এখন আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই যে, কোভিড আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। প্রথমেই জানাতে চাই যে, ৮ই মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হবার অনেক আগে থেকেই আমাদের প্রস্তুতির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্বতন্ত্র আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন, জনবল প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সামগ্রী সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রদত্ত পরামর্শ সম্পর্কে হাল নাগাদ থাকার প্রচেষ্টার মাধ্যমে এর সূচনা হয়েছে। কোভিড রোগীদের চিকিৎসার জন্য অত্র হাসপাতালে মোট ৮টি (৪টি পুরুষ এবং ৪টি মহিলা) ওয়ার্ডের অধীনে স্বতন্ত্র ৪৩টি কেবিনসহ সর্বমোট ১৬০টি শয্যা রয়েছে; যা কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের জন্য কোভিড সাসপেক্ট ওয়ার্ড এবং কোভিড পরবর্তী রোগীদের জন্য কোভিড রিকোভারী ওয়ার্ড রয়েছে। একই সাথে হাসপাতালটির ১৭তলায় ভেন্টিলেটর সুবিধাসহ ১০ বেডের একটি আইসিইউ ইউনিটও কর্যকর করা হয়েছে।

৭ জুলাই ২০২০ ইং সাল পর্যন্ত হাসপাতালের কোভিড ওয়ার্ডে মোট ৩৩৬জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। যাদের মধ্যে ২০৯জন রোগী ইতোমধ্যেই সুস্থ্য হয়ে বাড়ী ফিরেছেন এবং বর্তমানে ৮৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অর্থাৎ মোট ভর্তিকৃত রোগীর তুলনায় এখন পর্যন্ত সুস্থ্য হবার হার প্রায় ৯৩.৭ শতাংশ। এখন পর্যন্ত সবমিলিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪জন (৬.৩%) রোগী মারা গিয়েছেন। এছাড়া ৫জন রোগী হাসপাতালে পৌছার পূর্বেই মৃত্যুবরন করেছেন (Brought Dead) আর ৭জন এতটাই সংকটাপন্ন অবস্থায় ভর্তি হয়েছিলেন যে ভর্তির ৬ ঘন্টার মধ্যেই মৃত্যুবরন করেছেন এবং কোভিড ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ৭জন রোগী। বাকী ২৩জন রোগীকে অন্যত্র রেফার্ড করা হয়েছে। অপরদিকে, এখন পর্যন্ত মোট ৮জন রোগীকে (২.৬%) ভেন্টিলেটর সাপোর্টের মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে এবং আনন্দের সাথে আপনাদের জানাতে চাই যে, তাদের শতভাগই ভেন্টিলেটর সাপোর্টের বাইরে এসেছেন এবং একজন ছাড়া বাকী সবাই এখন সুস্থ এবং বাড়ী ফিরে গিয়েছেন। অন্য যে কোনো হাসপাতালের তুলনায় আমাদের এ ফলাফল অনেক উৎসাহব্যঞ্জক। কেননা বিশ্বব্যাপী ভেন্টিলেটর-এ থাকার পরে সুস্থ্য হবার হার খুবই হতাশাজনক এবং ক্ষেত্র বিশেষে তা শতকরা ৫-১০ ভাগ।

এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, কোভিড আক্রান্ত হয়ে মৃত রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুবরনের ৪ঘন্টা পর সরকারী প্রশাসন অনুমোদিত কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রটোকল অনুসরন করে ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুযায়ী মৃতদেহ প্রস্তুত করে (Dead Body Preparatory) মৃতদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় বা দাফনের জন্য মৃতদেহ আমাদের এ্যাম্বুলেন্স যোগে বাড়ীতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

উপস্থিত প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ!

আপনারা জানেন যে, কোভিড আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় অক্সিজেন সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা এখানে মোট ১০০জন রোগীর জন্য নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন পয়েন্ট বা সরবরাহের ব্যবস্থা করেছি। যদিও আমাদের এই হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ নয় কিন্তু এ কারনে আমাদের রোগীদের চিকিৎসা প্রদান ব্যবস্থায় অক্সিজেন ঘাটতি বা স্বল্পতা জনিত কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে সেরকম কোনো ঘটনা আজ পর্যন্ত ঘটেনি। আমরা এখন পর্যন্ত প্রায় চারশত কোভিড আক্রান্ত রোগীকে এখানে চিকিৎসা প্রদান করেছি এবং তাদের মধ্যে কারো অক্সিজেন ঘাটতি হয়েছে বা প্রয়োজনে অক্সিজেন পাননি এরকম একটিও অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। কেননা অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য আমরা রোগীদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করি। এর ফলে কারো যদি ৫লিটার অক্সিজেনের চাহিদা থাকে সেটা যেমন আমরা চিহ্নিত করতে পারি ঠিক কারো যদি আরো অতিরিক্ত চাহিদা থাকে সেটিও আমরা পূরণ করতে পারি। এছাড়াও রি-ব্রিথিং মাস্ক এবং ভেনচুরি মাস্ক এগুলো ব্যবহার করেও আমরা রোগীদের অক্সিজেন স্যাচুরেশন নিয়ন্ত্রনে সফল হয়েছি। আবার প্রয়োজনে তাদের অতিরিক্ত অক্সিজেন চাহিদা পূরনের অন্যান্য ব্যবস্থাও আমাদের হাতে আছে। যেমন রোগীদের বাড়তি অক্সিজেন প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য ৫টি হাই-ফ্লো অক্সিজেন হিউমিডিফায়ার জেনারেটর ডিভাইস স্থাপন করেছি যেটাকে আজকাল হাই-ফ্লো অক্সিজেন ক্যানুলা বলে সাবই জানে। কারন ইনভেসিভ ভেন্টিলেটরের হতাশাব্যাঞ্জক বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতায় আমরা শুরু থেকেই ভেন্টিলেটর নির্ভরতা সীমিত রাখতে সচেষ্ট ছিলাম।

এরপর আসা যাক কোভিড আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়। একথা সত্য যে, কোভিড-১৯ চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত প্রমানিত কোনো ব্যবস্থাপনা নির্র্ধারিত হয়নি। তবু আমরা কোভিড আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে মূলত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আমাদের নিজস্ব গাইডলাইন অনুসরন করে থাকি। এক্ষেত্রে আমরা উল্লেখ করতে চাই যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে সকল ঔষুধ ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে আমরা শুধুমাত্র সেগুলো ব্যবহার করে আমাদের এখানে ভর্তিকৃত রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করছি। এছাড়াও গুরুতর আক্রান্তদের জন্য উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঔষুধ যেমন- রেমিডিসিভির, ফেবিপিরাভির ইত্যাদি আমাদের সংগ্রহে রয়েছে যদিও বাংলাদেশে এই ঔষুধগুলো প্রাপ্তিতে মারাত্নক সংকট রয়েছে কিন্তু আমরা আমাদের কার্যকর সাপ্লাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরাসরি এগুলো সংগ্রহ করে থাকি এবং ভর্তিকৃত রোগীদের জন্য তা নির্ধারিত মূল্যে প্রাপ্তি নিশ্চিত করে থাকি। ফলে ঔষুধের দুশ্চিন্তায় রোগীর আত্মীয়-স্বজনকে নাজেহাল হতে হয় না। অপরদিকে ৪০ উর্দ্ধ ব্যক্তি অথবা কো-মর্বিডিটি সম্পন্ন ব্যক্তি যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়েবেটিস রয়েছে তাদের রক্ত জমাট প্রতিরোধেও ঔষুধ প্রয়োগ করা হয়। এছাড়াও ভর্তিকৃত রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য একটি স্বীকৃত প্রটোকল অনুসরন করা হয় এবং CBC, D. Dimer, CPK, S. Ferretin প্রভৃতি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর রোগের ক্যাটাগরী নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয় এবং সেই মোতাবেক চিকিৎসা প্রদান করা হয় এবং নিয়মিত মনিটরিং এ রাখা হয়।

রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থায় ফিজিওথ্যারাপীর আওতায় আমরা প্রত্যেক রোগীকে প্রোনিং করি। এছাড়াও রোগীদের একঘেয়ামী দূর করার জন্য আমরা করোনা ওয়ার্ড ও কেবিনগুলোতে ওয়াই-ফাই ব্যবস্থা রেখেছি, যাতে রোগীরা তাদের নিজস্ব ডিভাইস দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। এছাড়াও কোভিড রোগীরা যে সমাজে অচ্ছুৎ বা অস্পৃশ্য নয় সে বিষয়ে সজাগ থাকতে আমরা নিয়মিত মনো বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম গ্রহন করি এবং মানসিকভাবে উদ্দীপ্ত রাখতে সচেষ্ট থাকি।

এছাড়াও পোস্ট-কোভিড ওয়ার্ডের আওতায় আমরা Psychological Checkup, Respiratory Exercise, রোগীর ডায়েট এবং কাউন্সিলিং প্রদান করে থাকি। এর পর রোগীকে পুনরায় টেস্ট করা হয় এবং ফলফল নেগেটিভ হলে তাকে ডিসচার্জ করে বাড়ীতে পাঠানো হয় এবং বাড়ীতে যাওয়ার পরেও আমরা নিয়মিত তাদের পর্যবেক্ষনে রাখি। 

করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য আমাদের একাধিক বিশেষ কার্যক্রম রয়েছে। যেসকল ব্যক্তির করোনা পজিটিভ কিন্তু তারা বাসায় অবস্থান করেই চিকিৎসা নিতে ইচ্ছুক তাদেরকে আমরা Under Surveillance Treatment করি। আমাদের এই ধরনের সেবা যারা গ্রহন করেছেন তাদের মধ্যে এতদ্বঞ্চলের অনেক উল্লেখযোগ্য পরিবারের সদস্যবৃন্দও রয়েছেন।

এছাড়াও কোভিড চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার উপর আমাদের বেশ কিছু চলমান গবেষণা প্রকল্প রয়েছে যেমন: ইনফেকশন রেট, রোগী ভর্তি ও হাসপাতালে অবস্থান কাল, রোগীর মৃত্যুহার, চিকিৎসা সফলতা, আরোগ্য হার, আইসিইউ স্থানান্তরের হার, বিভিন্ন ঔষুধের কার্যকারীতা প্রভৃতি। প্রকাশ উপযোগী পর্যাপ্ত ডাটা নিশ্চিত হয়ে আমরা তা প্রকাশ করতে চাই, স্বল্প ডাটা ভিত্তিক অসম্পূর্ণ প্রকাশনা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

প্রিয় বন্ধুরা!

আমাদের এই হাসপাতালে কোভিড আক্রান্ত ব্যক্তিদের সেবা প্রদানের সাথে সাথে আমরা যে বিষয়টির প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি তা হলো এই স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য যারা নিরলসভাবে কাজ করছেন অর্থাৎ চিকিৎসক, নার্স, আয়া-ওয়ার্ড বয় প্রভৃতি জনবলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অত্র হাসপাতালে প্রায় ৬০জন চিকিৎসক, দেড় শতাধিক নার্স, RT-PCR Lab-এ ৩২জন মেডিকেল স্টাফ এবং দেড় শতাধিক লজিস্টিক সেবা প্রদানকারী জনবল কোভিড আক্রান্তদের সেবায় নিয়োজিত রযেছে। আমরা আপনাদের জানাতে চাই যে, যে সকল জনবল অত্র হাসপাতালে সরাসরি কোভিড আক্রান্তদের চিকিৎসায় নিয়োজিত রয়েছেন তাদের মধ্য থেকে এখন পর্যন্ত একজনও কোভিডে আক্রান্ত হননি। যেখানে বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী গত ৪ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ৪৯৫৭ জন স্বাস্থ্য কর্মী (ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মী) করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মোট ৬১জন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। শুধু বগুড়াতেই ৩৩জন চিকিৎসক, ৫৩জন নার্স এবং ৬৪জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। দেশের এরকম পরিস্থিতিতে আমাদের এই সফলতা নিঃসন্দেহে অন্যদের সাহস ও অনুপ্রেরণা যোগাবে। তাই আমরা এর পেছনের কারনগুলো আপনাদের জ্ঞাতার্থে উল্লেখ করতে চাই- করোনার চিকিৎসায় নিয়োজিত জনবলসহ সকল পর্যায়ের জনবলকে কতগুলো নিয়ম-কানুন আবশ্যিকভাবে মেনে চলতে হয়, যার মধ্যে অন্যতম

  • কোনো অবস্থাতেই জোন কনটামিনেট না করা অর্থাৎ যে যেই জোনে কাজ করছে সেই জোনের জন্যই সামগ্রীকভাবে কাজ করা। কোন ভাবেই নিজ জোনের বাইরে না যাওয়া।
  • মানসম্পন্ন প্রোটেক্টিভ গাউন, এন ৯৫ বা সমমানের মাস্ক, আইশিল্ড, ফেস প্রটেক্টর, হেড কভার, সু কভার, গ্লাভস প্রভৃতি সুরক্ষা সামগ্রী পরিধান করা।
  • সকল স্বাস্থ্যকর্মী তথা চিকিৎসক, নার্স, সাপোর্ট স্টাফ, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক প্রবেশমুখ এবং বহিঃগমনপথ নিশ্চিত করা, পৃথক লিফটের ব্যবস্থা করা, প্রবেশমুখে হাত ধোয়া এবং হাত শুকানোর ব্যবস্থা, জীবাণুনাশক বুথের মাধ্যমে শরীর জীবাণুমুক্ত করা প্রভৃতি ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য।
  • সর্বোপরী একেবারে শুরু থেকে Triage System ফলো করা হচ্ছে যার মাধ্যমে (ফিজিক্যাল, ম্যানপাওয়ার, লজিসটিকস প্রভৃতি তিন স্তরে বিভক্ত) আউটডোর, ইনডোর ও অন্যান্য সার্ভিস প্রদান করা হচ্ছে। ফলে কোভিড ও নন-কোভিড সেবা কার্যক্রমে স্বল্পসংখ্যক জনবল নিয়োজিত করেও সফলতার সাথে পরিচালনা করা হচ্ছে।

এই বিষয়গুলোতে আমরা অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম। যা আমাদের সফলতার পেছনে কাজ করছে। এর বাইরেও চিকিৎসায় নিয়োজিত জনবল বিশেষত চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য সাপোর্ট স্টাফদের সুরক্ষা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ বা ওরিয়েন্টেশ নিয়মিতভাবে প্রদান করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো করোনা রোগী ও ওয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট, পিপিই ডোনিং ও ডোফিং এবং বিনষ্ট প্রক্রিয়া ইত্যাদি।

আপনাদের জ্ঞাতার্থে আমরা আরো একটি বিষয় আজকের এই সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করতে চাই। আমাদের এখানে স্টাফদের পিপিই ডোনিং এবং ডোফিং সার্বক্ষনিকভাবে একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির তত্ত্বাবধায়নে করা হয়ে থাকে। যেখানে এ বিষয়টি অনেক জায়গায় হয়তো গুরুত্বহীনভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে এবং যার ফলে পিপিই পরা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য কর্মীরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। একই সঙ্গে আমরা সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহৃত পিপিইসমূহ নির্দিষ্ট প্রটোকল অনুযায়ী রিসাইকেল করে থাকি এবং পুনরায় ব্যবহার করি। আরেকটি বিষয় যোগ করতে চাই যে, আমাদের এখানে যারা রেড জোন এবং আইসিইউ-তে কাজ করছে তাদেরকে পিপিই’র উপর পরিধানের জন্য একটি Water Proof Aproan প্রদান করা হয়; যা সেবা কর্মীদের বাড়তি নিরাপত্তা প্রদান করে এবং এর সুফলও দৃশ্যমান।

উপস্থিত সাংবাদিক ভাইয়েরা!

আমাদের এই হাসপাতালে আগত রোগী ও দর্শনার্থীদের যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছি। হাসপাতালে প্রবেশ এবং বহিঃগমনের জন্য স্বতন্ত্র রাস্তা, সম্পূর্ণ হাসপাতালকে কোভিড ও নন-কোভিড জোনে বিভক্ত করা এবং লাল, হলুদ এবং সবুজ রং দ্বারা জোনসমূহ দৃশ্যমান করা, প্রতিটি প্রবেশমুখে জিবাণুমুক্তকরণ বুথ, হাত ধোঁয়া ও শুকানোর ব্যবস্থা করা, শরীরে তাপমাত্রা পরিমাপ করা, কোভিড এবং নন-কোভিড রোগী ও জনসাধারনের জন্য লিফট্সমূহকে পৃথক করা, হাসপাতালের ভিতরে ও বাহিরে খোলা জায়গাসমূহে নিয়মিতভাবে জীবনুনাশক স্প্রে করাসহ জীবানুমুক্তকরণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

আমাদের এই হাসপাতালে সন্দেহজনক কোভিড রোগী আসলে আমরা প্রথমে তাকে হলুদ জোনে ভর্তি করি। তারপর দ্রুততার সাথে ওই রোগীর স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয় এবং মাত্র ৪ঘন্টার মধ্যে (সম্ভবত দেশের সবচেয়ে কম সময়ে) স্যাম্পল পরীক্ষার মাধ্যমে কোভিড আক্রান্ত কি না তা নিশ্চিত করা হয়। এক্ষেত্রে ফলাফল পজিটিভ হলে উক্ত রোগীকে লাল জোনে (কোভিড ওয়ার্ডে) এবং নেগেটিভ হলে গ্রীণ জোনে ভর্তি করে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। তবে জরুরী প্রয়োজন দেখা দিলে যেমন সিজারিয়ান, হাড় ভাঙ্গা বা অন্যান্য রোগাক্রান্ত সাসপেক্টেড ওয়ার্ডের রোগীদের হলুদ অপারেশন থিয়েটারে জরুরী ভিত্তিতে অস্ত্রপচার করা হয়।

করোনা রোগীদের পর্যাপ্ত সেবা, সেবায় নিয়োজিতদের সুরক্ষা প্রভৃতি বিষয়গুলো নিশ্চিত করার জন্য ৬টি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। ট্রায়েজ (Triage) গাইডলাইন, করোনা ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন, স্বাস্থ্য বিধি গাইডলাইন, পিপিই পুনঃব্যবহার সংক্রান্ত গাইডলাইন, পিপিই পরিধান ও পরিত্যাগ (Donning & Doffing), স্যানিটাইজার, মাস্ক, গ্লাভ্স, গামবুট, হেড কভার, সু কভার, গগল্স, ফেস শিল্ড ইত্যাদি বিতরণ সংক্রান্ত গাইডলাইন; এবং পিপিই অটোক্ল্যাভ সংক্রান্ত গাইডলাইন। চিকিৎসা প্রদানের প্রতিটি স্তরে এই সকল গাইডলাইন অনুসরন করা হয়ে থাকে। এছাড়াও আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এবং টিএমএসএস হ্যান্ডিক্রাফটস’র মাধ্যমে আমরা অন্যতম পিপিই যেমন কাভার অল, ফেস শীল্ড, সাধারন ফেস মাস্ক ইত্যাদি নিজেরাই তৈরী করে থাকি।

প্রিয় সাহসী যোদ্ধা বন্ধুগণ

উপরে উল্লিখিত প্রতিকারমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি টিএমএসএস স্বাস্থ্য সেক্টরের পক্ষ থেকে দেশে করোনা সংক্রমনের আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে এবং এ সম্পর্কিত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষত ভাইরাসটি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে টিএমএসএস হাসপাতালে কর্মরত প্রায় নয় শতাধিক চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং সাপোর্ট ষ্টাফসহ অন্যান্য কর্মীদের এবং মাঠ পর্যায়ের সাব-ক্লিনিকসমূহে কর্মরত তিন শতাধিক কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহনে ‘নভেল করোনাভাইরাস ২০১৯ ডিজিজ কোভিড-১৯ আপডেট’ শীর্ষক তিনটি পৃথক সাইন্টিফিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। মাঠ পর্যায়েও জন সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্বাস্থ্য সেক্টরের পক্ষ থেকে সচতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এই কার্যক্রমের আওতায় টিএমএসএস’র ৯৬ টি সাব-ক্লিনিক (টিএইচসিসি) ও ৪টি ফিল্ড হাসপাতালের মাধ্যমে এ পর্যন্ত সংস্থাটির ৪ লক্ষ ৭৫ হাজার গ্রুপ সদস্যদের মাঝে করোনা ভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে, প্রায় দশ লক্ষ লিফলেট মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়েছে এবং জন সচেতনতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে এবং আমাদের ফিল্ড টিম অব্যাহতভাবে বাসায় গিয়ে কোভিড ও নন-কোভিড রোগীর চিকিৎসা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন।

প্রিয় সহকর্মী বন্ধুগণ!

এই পর্যায়ে আমরা আপনাদেরকে আমাদের পিসিআর-ল্যাব কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করতে চাই। ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বাইরে প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হিসেবে আমরা সর্বপ্রথম আরটি-পিসিআর ল্যাবের মাধ্যমে কোভিড-১৯ ভাইরাস পরীক্ষা করার অনুমোদন পাই এবং গত ৩১ মে থেকে আমরা এখানে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা শুরু করি। দেশের মধ্যে আমরাই সম্ভবত সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে (মাত্র ৪ ঘন্টার মধ্যে) কোভিড পরীক্ষার ফলাফল প্রদান করতে পারি যেটা বাংলাদেশের আর কোনো হাসপাতাল বা পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রদান করা হয় কিনা আমাদের জানা নেই। আমাদের এখানে স্যাম্পল কালেকশন করার জন্য প্রায় ত্রিশজন দক্ষ এবং প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জনশক্তি রয়েছে। যারা আমাদের নিজস্ব বুথ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ প্রক্রিয়ায় স্যাম্পল কালেকশন করার পাশাপাশি বাসা থেকেও স্যাম্পল কালেকশন করে থাকে। এছাড়াও প্রয়োজন অনুয়ায়ী সরকারি স্যাম্পল কালেকশন প্রক্রিয়াতেও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছে। গত ৭ জুলাই পর্যন্ত আমরা মোট ৪ হজার ৫ শত ৭৮ জনের কোভিড-১৯ পরীক্ষা করেছি। যার মধ্যে ৩৫% (১৫৮৭জন) পজেটিভ রোগী পাওয়া গেছে এবং ৬৬% (২৯৯১জন) নেগেটিভ রোগী পাওয়া গেছে। পজিটিভ রোগীদের মধ্যে পুরুষ ৭৫% আর নারী ২৫% রয়েছেন। বয়স ভিত্তিক বিশ্লেষনে দেখা যায় যে, কোভিড পজিটিভ ব্যক্তিদের মধ্যে ১-১০ বছর বয়সের মধ্যে ১.৪% (২৩জন), ১১-২০ বছরের মধ্যে ৫.২% (৮৩জন), ২১-৩০ বছরের মধ্যে ১২.৫% (১৯৮জন), ৩১-৪০ বছরের মধ্যে ২৮.৬% (৪৫৪জন), ৪১-৫০ বছরের মধ্যে ২৩.২% (৩৬৮জন), ৫১-৬০ বছরের মধ্যে ১৮.৫% (২৯৪জন) এবং ৬০ বছরের উর্দ্ধে রয়েছে ১০.৫% (১৬৭জন)। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৪% (১০১৬জন) বগুড়া সদর উপজেলার, বগুড়া সদরের বাইরে বগুড়ার অন্যান্য উপজেলার রয়েছে ১৮.৩% (২৯০জন), গাইবান্ধা জেলার ৪.৯% (৭৮জন), জয়পুরহাট জেলার ৪.৯% (৭৪জন), নওগা জেলার ৩.৪% (৫৪জন), সিরাজগঞ্জ জেলার ২.১% (৩২জন), এছাড়াও দিনাজপুর, পাবনা, নাটোর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, টাংগাইল এবং ঢাকা জেলার বাসিন্দারাও রয়েছেন।

উপস্থিত সাংবাদিক বন্ধুগণ!

এতক্ষন আমরা আপনাদের সামনে কোভিড চিকিৎসার দিকসমূহ উল্লেখ করেছি। একই সাথে আপনাদের জানাতে চাই যে, নন-কোভিড অর্থাৎ কোভিড আক্রান্ত নন এমন সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা সেবার জন্য হাসপাতালের বহিঃবিভাগ এবং অন্তঃবিভাগ চালু রয়েছে এবং সকল রোগীকেই বিশেষ করে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, পক্ষাঘাত, হাঁপানি-শ্বাসকষ্ট, লিভার ও কিডনির রোগ, গর্ভবতী নারী ও প্রসূতি সেবা ইত্যাদি নিয়মিতভাবে প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়াও নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন, কিডনী ডায়ালাইসিস, সিসিইউ, ডে-কেয়ার চালু রেখে বিভিন্ন সেবা প্রদান করা হচ্ছে। নন-কোভিড রোগীদের জন্যেও একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে, সেই মোতাবেক তাদের চিকিৎসা প্রদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

সবশেষে আমরা আপনাদের জানাতে চাই যে, আমাদের হাসপাতালে আগত কোনো সেবা প্রত্যাশিকে আমরা প্রত্যাখান করি না। তা তিনি যত ক্রিটিকাল অবস্থাতেই থাকুননা কেন। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে আগত রোগীদের সেবা প্রদানের চেষ্টা করি। রোগী ভর্তি নেয়ার ক্ষেত্রেও আমরা কোনো ক্যাটাগরী বিবেচনা করি না। এমনকি এই দূর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে আমরা এমন কিছু রোগী ভর্তি করেছি যারা হাসপাতালে আসার ৫-১০ মিনিটের মধ্যে মারা গেছেন। তা স্বত্ত্বেও আমরা তাদেরকে ভর্তি করতে অস্বীকার করিনি। এমনকি সরকারী হাসপাতাল থেকে যেসকল ক্রিটিকাল রোগী আমাদের এখানে এসেছেন আমরা তাদেরকেও ভর্তি করেছি এবং আমাদের সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের চেষ্টা করেছি। আমরা আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, অসহায় মানুষদের সেবা করার যে মহান ব্রত নিয়ে আমরা কাজ করছি তা যে কোনো মূল্যেই অব্যাহত রাখার চেষ্টা করবো।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ!

আপনাদের বৈশিষ্টসমূহ আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। যার মধ্যে রয়েছে-

ব্যবস্থাপনা বৈশিষ্টসমূহ:

  • পূর্ব প্রস্তুতি- আকস্মিকতায় বিশৃঙ্খলা না হওয়া;
  • সমন্বয় ও শৃঙ্খলা;
  • আস্থা অর্জন, পারস্পারিক কমিটমেন্ট বা প্রত্যয় সৃষ্টিতে সক্ষমতা;
  • উর্ধ্বতন প্রদত্ত দ্রুত ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা;
  • প্রাতিষ্ঠানিক স্বয়ং সম্পূর্ণতা;
  • তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের সক্ষমতা;
  • প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় স্তর ভিত্তিক প্রস্তুতি;
  • বিকল্প ব্যবস্থাপনা;
  • নিশ্চিদ্র সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, স্তর ভিত্তিক দায়িত্ব বিকেন্দ্রীকরন; এবং
  • ভিন্নধর্মী প্রনোদনা।

আমাদের সেবা পর্যায়ের বৈশিষ্টের মধ্যে রয়েছে

  • সুরক্ষা- সুরক্ষা- সুরক্ষা;
  • সুরক্ষা প্রনোদনা;
  • ট্রায়াজ (অগ্রাধিকার ও সুনির্দিষ্টকরন);
  • সবুজ-হলুদ- লাল, বাস্তবিক ও দৃশ্যমান আক্ষরিক নয়;
  • লাগসই প্রযুক্তি- সেন্ট্রাল লাইন বিকল্প;
  • অক্সিজেন চিকিৎসায় স্তর ভিত্তিক গাইড লাইন ৫-১০লি, ১০-১৫লি,১৫লি তদুর্ধ্ব;
  • আইসিইউ নির্ভরতা হ্রাস;
  • ঝুঁকিপূর্ণ রোগী চিহ্নিতকরন- বয়স্ক, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট;
  • রোগী মনিটরিং এ বিজ্ঞান ভিত্তিক এপ্রোচ
    • অক্সিজেন স্যাচুরেশন
    • ল্যাব পরীক্ষা
    • সিটি স্ক্যান প্রয়োজন ক্ষেত্রে
  • মানসিক সেবা।

আমাদের কমিউনিকেশন বৈশিষ্টের মধ্যে রয়েছে

  • Whats App
  • Zoom Meeting
  • Video Surveillance
  • Triage Flowchart

প্রিয় সুহৃদ!

আজকের এই সংবাদ সম্মেলনে আমরা আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে তাদের যারা এই করোনা যুদ্ধে আমাদের পাশে থেকে আমাদেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। আমরা ধন্যবাদ জানাতে চাই রোটারী ক্লাব রমনা, রোটারী ক্লাব অব বগুড়া এবং রোটারী ইন্টারন্যাশনালকে। যাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত প্রকল্প দুইটি রোটারী ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক অনুমোদন লাভ করায় টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোভিড-১৯ পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা চালুর জন্য RT-PCR ল্যাব প্রতিষ্ঠা, ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মেডিকেল ই্কুইপমেন্টসহ আইসিইউ সেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই এম খায়রুল আলম, ডিস্ট্রিক গভর্ণর, রোটারী ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ; রোটা. আশেক-উল ইসলাম, পাস্ট প্রেসিডেন্ট, রোটারী ক্লাব অব রমনা; মোঃ মামদুদুর রহমান (শিপন), পাস্ট প্রেসিডেন্ট, রোটারী ক্লাব অব বগুড়া।

টিএমএসএস স্বাস্থ্য সেক্টরের এই যাবতীয় কার্যাদী যার নির্দেশনা এবং সহযোগীতায় পরিচালিত হচ্ছে তিনি টিএমএসএস এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগম। স্বাস্থ্য কর্মীদের যাবতীয় চিকিৎসা, প্রনোদনাসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্য তাঁর নির্দেশনা রয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে নির্বাহী পরিচালক মহোদয়কে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

প্রিয় সাহসি বন্ধুগণ!

বন্ধুরা আমি এই কথা বলে শেষ করতে চাই যে, মহামারী প্রতিরোধে অতি পুরাতন এবং প্রচলিত একটি কথা হচ্ছে “মহামারী প্রতিরোধে সফল হতে গেলে মহামারীর আগে থাকতে হয়, পেছন থেকে  মহামারীকে স্পর্শ করা কখনোই সম্ভব না এবং পরাজিত করাতো দুঃসাধ্য”। আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানে কোভিড এলাকায় কর্মরতসহ সকল জনবলের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোভিড আক্রান্তদের চিকিৎসারও পূর্ণ ব্যবস্থা রেখেছি। আরো রয়েছে এই সংক্রমন এলাকায় কর্মরতদের জন্য আর্থিক প্রনোদনা এবং স্বীকৃতির ব্যবস্থাও। তবে একটি বিশেষত্ত্ব এখানে উল্লেখ করার মতন, যেখানে প্রচলিত সকল জায়গাতে যারা কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের জন্য প্রনোদনা প্রদানের ব্যবস্থা করা হলেও আমরা তার বিপরীতে একটি ভিন্ন ধারা প্রবর্তন করবার প্রয়াস পেয়েছি। সেটি হলো কোভিড এলাকায় কর্মরত জনবলের মধ্যে যারা নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে সংক্রামনমুক্ত রাখতে পেরেছেন তাদের জন্য বাড়তি প্রনোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে যা আমাদের স্বাস্থ্য কর্মীদের সুরক্ষার জন্য নিজেদের প্রতি আরো বেশি মনোযোগী এবং সতর্ক হতে সাহায্য করবে। আমরা মনে করি যে, এই ধারনাটি প্রচলিত করলে এটি স্বাস্থ্য কর্মীদের সংক্রমনের হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রিয় সহযোদ্ধাগন!

আপনাদের মাধ্যমে আমাদের এযাবৎ গৃহীত কার্যক্রম ও অভিজ্ঞতা যদি দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত হাসপাতাল ব্যবস্থাপক, চিকিৎসক, সেবা প্রত্যাশী বা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে এবং তা থেকে যদি কেউ সামান্যতম উপকৃত হয়, তাহলে আমরা আমাদের এই আয়োজনকে সার্থক মনে করবো।

এখানে উপস্থিত, অনলাইনে সংযুক্ত সকলকে পরিশেষে ধন্যবাদ জানাই ধৈর্য্য সহকারে আমাদের বক্তব্য শোনার জন্য।

সাধারনের পাশে করোনা যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত সামনে থাকার অঙ্গীকার প্রকাশ করে মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহ প্রার্থনা করে শেষ করছি। সবার সুস্থাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আল্লাহ হাফেজ।

ধন্যবাদান্তে-

গবেষণা, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ, টিএমএসএস গ্র্যান্ড হেলথ সেক্টরের পক্ষে-

অধ্যাপক ডা. মওদুদ আলমগীর পাভেল

নির্বাহী উপদেষ্টা (গবেষণা, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), গ্র্যান্ড হেলথ সেক্টর, টিএমএসএস।

এবং

টিএমএসএস গ্র্যান্ড হেলথ সেক্টরের পক্ষে-

রোটা. ডা. মোঃ মতিউর রহমান

উপ-নির্বাহী পরিচালক-২

টিএমএসএস, বগুড়া।